Showing posts with label ধর্ম. Show all posts
Showing posts with label ধর্ম. Show all posts

খোশ আমদেদ মাহে রমজান

১৪৩৭ হিজরির প্রথম রোজা আজ। রহমতের প্রথম দিন। ইসলাম ধর্মের পাঁচ স্তম্ভের তৃতীয় স্তম্ভ হলো রমজানের রোজা। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পরই ইবাদত হিসেবে রয়েছে রোজার স্থান। বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ বছরান্তে এ মাসের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। মুমিন-মুসলমানরা রমজানকে সাদরে গ্রহণ করে জানান, খোশ আমদেদ মাহে রমজান, আহলান ওয়া সাহলান মাহে রমজান, আসসালামু আলাইকা ইয়া শাহরাস সিয়াম।
মাহে রমজানে সারা বিশ্বের মুসলমানের মতো বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আগামী দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টাব্যাপী এক মাস আল্লাহতায়ালার নির্দেশ পালনার্থে রোজা রাখবেন। পবিত্র রমজানের আগমনে দেশের জনগণের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। রমজান মাসে সর্বত্র বিরাজ করে ধর্মীয় এক আবহ। যারা ছোট তাদের রোজা না রাখলেও চলে; তারপরও তাদের মধ্যে চলে রোজা রাখা নিয়ে প্রতিযোগিতা। রোজা উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রতিদিন বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ ও টেলিভিশনগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে।
প্রত্যেক সুস্থ মুসলিম নর-নারীর ওপর রোজা রাখা ফরজ। রমজান মানব জীবনে আলোর অতিথি। কেননা এ মাস অন্তরের সব কালিমা, সব দূষিত বস্তুকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয় এবং মানুষকে উন্নত আলোকময় দিগন্তের দিকে নিয়ে যায়। রমজান মাস রহমত, বরকত ও মাগফিরাত পরিবেষ্টিত। এ মাসে আত্মশুদ্ধির কষ্টিপাথরে নিজেকে যাচাই ও বিশুদ্ধ করার সুযোগ মেলে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পবিত্র রমজান দয়া, কল্যাণ ও ক্ষমার মাস। এ মাস আল্লাহতায়ালার কাছে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা।’ তাই এ মাসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে। তিনি যেন আমাদের রোজা রাখার এবং রোজার মাসে পরিপূর্ণ বরকত হাসিল করার তৌফিক দান করেন।

মুবারক হো মাহে রমজান

মাহে রমজানের মাহাত্ম্য 
রহমত, বরকত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও নিষ্কৃতির বার্তা নিয়ে আবার আমাদের মাঝে এসে হাজির হয়েছে মাহে রমজান। মাহে রমজান মুসলিম মিল্লাতের জন্য অনন্ত সওগাত বয়ে আনে পুন্যাশ্রয়ী জীবনের সকল অঙ্গনে। ইমাম বায়হাকী (রহ.) মাহে রমজানের আগমনী সংবাদ হযরত সালমান আল ফারসী (রা.)-এর বর্ণনায় এভাবে তুলে ধরেছেন। “হযরত সালমান আল ফারসী (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের শেষ দিন আমাদেরকে সম্বোধন করে এক ভাষণ প্রদান করেন। তাতে তিনি বলেন, ‘হে জনম-লী! এক মহাপবিত্র ও বরকতপূর্ণ মাস তোমাদের মাথার ওপর ছায়া সম্প্রসারিত করেছে। এ মাসের একটি রাত বরকত ও ফজিলত এবং মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের দিক থেকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এই মাসের সিয়াম সাধনাকে আল্লাহ পাক ফরজ করেছেন এবং এর রাতগুলোতে আল্লাহর সম্মুখে দ-ায়মান হওয়াকে নফল ইবাদতরূপে নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি এই রাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় কোন সুন্নত বা নফল ইবাদত আদায় করবে, তাকে এর বিনিময়স্বরূপ অন্য সময়ের ফরজ ইবাদতের সওয়াব প্রদান করা হবে। আর যে ব্যক্তি এই মাসে কোন ফরজ এবাদত সম্পাদন করবে সে অন্যান্য সময়ের সত্তরটি ফরজ ইবাদতের সমান পুন্য লাভে ধন্য হবে।

 এই মাসটি মূলত ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ত্যাগ-তিতীক্ষার মাস। আর ধৈর্য ও সবরের বিনিময়ে আল্লাহ পাকের নিকট জান্নাত লাভ করা যাবে। এই মাসটি পরস্পর সহৃদয়তা দয়া-দাক্ষিণ্য, সৌজন্য ও সম্প্রীতির মহিমায় ভরপুর। এই মাসে মুমিন বান্দাহদের রিজিক আল্লাহ পাক প্রশস্ত করেছেন। এই মাসে যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে বিনিময়স্বরূপ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং জাহান্নাম হতে তাকে মুক্তি ও নিষ্কৃতি প্রদান করা হবে এবং তাকে আসল রোজাদারের সমান পুন্য প্রদান করা হবে।কিন্তু এর জন্য আসল রোজাদারের পুন্যকে আদৌ কম করা হবে না।

হযরত সালমান আল ফারসী (রা.) বলেন, আমরা আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সবাই রোজাদারকে ইফতার করানোর সামর্থ রাখে না, তাদের অবস্থা কীরূপ হবে? রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তর করলেন, যে ব্যক্তি রোজাদারকে একটা খেজুর, দুধ বা এক ঢোক সাদা পানি দ্বারা ইফতার করাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সে লোককেও এই সওয়াব প্রদান করবেন। আর যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে পরিপূর্ণ মাত্রায় পরিতৃপ্ত করবে তাকে আল্লাহ পাক আমার হাউজে কাওসার হতে এমন পানীয় পান করাবেন, যার ফলে চিরসুখময় জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত কখনো সে পিপাসার্ত হবে না। 

আর মাহে রমজান এমন একটা মাস যার প্রথম দশদিন রহমতের বারিধারায় পরিপ্লুত। দ্বিতীয় দশদিন ক্ষমা ও মার্জনার জন্য অবারিত এবং শেষ দশদিন জাহান্নাম হতে মুক্তি ও নিষ্কৃতির উপায় হিসেবে নির্ধারিত। আর যে ব্যক্তি এই মাসে নিজের অধিনস্ত লোকদের পরিশ্রম ও মেহনত হালকা করে দেবে মহান রাব্বুল ইজ্জত তাকে ক্ষমা প্রদান করবেন এবং জাহান্নাম হতে মুক্তি ও নিষ্কৃতি দান করবেন। 

তাই, মুসলিম মিল্লাতের জন্য বারটি মাসের মধ্যে রমজান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই মাসের আগমনে গোটা মুসলিম জাহানে এক বিরাট চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মুমিন-মুসলমানগণ সিয়াম সাধনায় আত্মনিয়োগ করার জন্য উদগ্র-আকাক্সক্ষায় উদ্বেলিত হয়ে উঠে। মহান রাব্বুল আলামীন কুরআনুল কারীমে এই মাসের মাহাত্ম্য ও মর্যাদাকে এভাবে তুলে ধরেছেন। ইরশাদ হয়েছে : “রমজান মাস এমন একটি মাস যে এই মাসেই কুরআনুল মাজীদ নাজিল হয়েছে। (সূরা বাকারাহ : আয়াত ১৮৫)”। ইসলামী বার মাসের মধ্যে আল কুরআনে কেবলমাত্র একটি মাসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাহলোÑ রমজান। এই রমজান নামটি খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ও তাৎপর্যম-িত। রমজান নামটি আরবী ‘রমজ’ ধাতু হতে গৃহীত। এর অর্থ দহন, জ্বলন, সিয়াম সাধনার দরুণ ক্ষুৎপিপাসায় তীব্রতায় রোজাদারের পেট জ্বলতে থাকে।

মাহে রমজানে রোজার ফজিলত কি?

মাহে রমজান অফুরন্ত রহমত, বরকত, মাগফিরাত, নাজাত ও ফজিলত পূর্ণ মাস। পবিত্র এই রমজান মাসের রোজার ফজিলত বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। নবী করিম (সা) মাহে রমজানের রোজার ফজিলত বণর্না করে বলেছেন -’যারা নিজ পরিবারবর্গ সহ সন্তুষ্টি সহকারে রমজানের ৩০ টি রোজা রেখেছে, হালাল বস্তু দ্বারা ইফতার করেছে আল্লাহ তাআলা তাদের ওই প্রকার পুণ্যদান করবেন, যেন তারা মক্কা ও মদিনা শরীফে রোজা রেখেছে।’
আল্লাহপাক হজরত মুসা (আ) কে একদা বলেছিলেন, হে মুসা! যে ব্যক্তি এই রমজান মাসে রোজা রাখবে আমি তার আমল নামায় মানুষ, জ্বিন,পরী ও সব জীব জন্তুর পূণ্যের সওয়াব লিখে দেব। মহানবী (সা) বলেছেন ,’যে ব্যক্তি এই মাসে একজন রোজাদার কে ইফতার করাবে তার (সগীরা) গুনাহ সমূহ মাফ হয়ে যাবে এবং দোজখের আগুন থেকে সে মক্তি পাব এবং সে সেই রোজাদারের সম পরিমান সওয়াব পাবে, অথচ তার রোজাদারের সওয়াবের কমতি হবে না।’
রাসুলুল্লাহ (সা) একদা শাবান মাসের শেষ দিনে সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে মাহে রমজানরে ফজিলত সম্পর্কে বলেছিলেন-’হে মানব গন! তোমাদের প্রতি একটি মহান মোবারক মাস ছায়া ফেলেছে। এই মাসে সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম একটি রজনী আছে। যে ব্যক্তি এই মাসে নেক আমাল দ্বারা আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য লাভের কামনা করে,সে যেন অন্য সময়ে কোন ফরজ আদায় করার ন্যায় কাজ করল। আর এই মাসে যে ব্যক্তি কোন ফরজ কাজ আদায় করে,অন্য সময়ে ৭০ টি ফরজ আদায়ের নেকি লাভ করার সমতুল্য কাজ করল। এটি সংযমের মাস, আর সংযমের ফল হচ্ছে জান্নাত।’
রাসুলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, রমজানরে প্রথম রাত্রি থেকে শয়তান গুলোকে বন্দি করা হয় এবং অবাধ্য জ্বীন গুলাকে আবদ্ধ রাখা হয়। জাহান্নামের দরজা গুলো বন্ধ রাখা হয়, সারা রমজান মাসে তা আর খোলা হয় না। আর জান্নাতের দরজা সমূহ খুরে দেওয়া হয়, সারা রমজান মাসে তা বন্ধ করা হয় না। হাদিস শরীফে বণির্ত আছে যে, নবী করিম(সা)ফরমান,’যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখে এবং এর রাত্রি গুলাতে ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে ইবাদত বন্দেগী করে, সে মায়ের গর্ভ থেকে সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে যাবে।’
হাদিস শরীফে আরও উল্লেখ আছে যে রমজান মাস রহমত বরকত,গুনাহ মাফ ও দোয়া কবুলের মাস। এই পবিত্র মাসে ফেরেশতা মন্ডলী মানষের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন বলেন, ‘হে কল্যান কামনাকারী! আল্লাহ তাআলার কথা স্মরন করো,তার ইবাদত বন্দেগীতে রত হও এবং একনিষ্ঠ মনে তওবা কর । তোমরা এই মাসে যা কামনা করবে ও প্রার্থনা করবে,আল্লাহ তাআরা তা কবুল করবেন।’
মাহে রমজানরে একটি বিশেষ ফজিলত বা মাহাত্ম হচ্ছে,এই পবিত্র রমজান মাসে আল কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রমজান মাসের রোজা মানুষকে পাপ-পংকিলতা থেকে মুক্তি দেয়,মানুষের কুপ্রবৃত্তি ধুয়ে মছে দেয় এবং আত্নাকে দহন করে ঈমানের শাখা প্রশাখা সন্জীবীত করে। সর্বোপরি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। এই মর্মে মহানবী (সা) ইরশাদ করেছেন,’রোজাদারের জন্য দুটি খুশি একটি হলো তার ইফতারের সময়, আর অপরটি হলো আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।(বুখারী ও মুসলিম)
নবী (সা) আরো বলেছেন- রোজাদারের মুখের ঘ্রান আল্লাহর নিকট মেশকেআম্বরের ঘ্রান অপেক্ষা অধিক তর পছন্দনীয়। এমনিভাবে পবিত্র কোর আন মাজিদে ও হাদিস শরীফে মাহে রমজানের রোজার বহুবিধ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। বস্তুত,রোজা উম্মতে মোহাম্মাদীর জন্য বরকত ও রহমত স্বরূপ। এর মধ্যে আল্লাহ তাআলার নেয়ামত, বরকত তথা মানুষের জন্য মুক্তি,শান্তি ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে। তাই পবিত্র কোরাআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনে ঘোষনা করেছেন,তোমাদের মধ্যে যে কেউ রমজান মাসে উপস্থিত(জীবিত)থাকে,তারই রোজা পালন করা কর্তব্য।(সুরা আল বাকারা আয়াত-১৮৫)
পরম করুনা ময় অতি দয়ালু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন আমাদের সবাইকে মাহে রমজানের রোজার ফজিলত,তার অপার করুনা ও রহমত সম্পর্কে উপলব্ধি করার,সঠিক ভাবে রোজা পালনের তৌফিক দিন।  ( আমিন)

রমজানের অন্যতম দান ইফতারের ফজিলত ও গুরুত্বঃ

এই পবিত্র রমজানুল মোবারকের অন্যতম দান হলো ইফতার। রসূল (স.) বলেন:কেউ যদি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করায় তাহলে ঐ ইফতার করানোটা তার গুনাহ মাফের ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং সে একটি রোজার সওয়াব পাবে অথচ রোজা পালনকারীর নেকী মোটেই কমানো হবে না।
ইফতারের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে স্বয়ং রাসুল (সা.) বলেছেন,‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে
১. ইফতারের সময় ২. মহান আল্লাহর সঙ্গে মোলাকাত বা সাক্ষাতের সময়’। (বোখারি ও মুসলিম)।

ইফতার কি :

ইফতার শব্দটি আরবি ফুতুর শব্দ থেকে এসেছে। ফুতুর- অর্থ নাস্তা। ইফতারের অর্থ খোলা, উন্মুক্ত করা, ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি। ইসলামী পরিভাষায় সূর্যাস্তের পর খেজুর, পানি বা কোনো খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণের মাধ্যমে রোজা ছেড়ে দেয়াকে ইফতার বলে।
দোয়া কবুলের অন্যতম সময় : পবিত্র রমজান মাসে ইফতারের সময় সত্যি একটিগুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। অদৃশ্য শক্তির আদেশ পালনার্থে ভীষণ ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও বনি আদম প্রহর গুনতে থাকে সূর্যাস্তের। এ সময় মহান আল্লাহ আদম জাতির ওপর সন্তুষ্ট হয়ে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘ইফতার করার সময় রোজাদারের দোয়া কবুল হয়ে থাকে।’ (আবু দাউদ শরীফ)।আর এ জন্যই হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রহ.) ইফতারের সময় পরিবারের সবাইকে সমবেত করে দোয়া করতেন।
দোয়া করতেন।
মহা পুণ্যের কাজ ইফতার করানো : মাহে রমজান ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতির শিক্ষা দিয়ে থাকে। এ মাসের কারণে মানুষ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার জ্বালা বুঝতে পারে। এ জন্য এক মুমিনের হৃদয় ধাবিত হয় অন্য মুমিনের সুখ-দুঃখের খবর সন্ধানে। যার বাস্তব রূপ প্রকাশ পায় ইফতারের মাধ্যমে। রাসূলে পাক (সা.) এরশাদ করেন, রমজান মাসে যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার গুনাহগুলো মাফ হয়ে যাবে। সে দোজখ থেকে মুক্তি পাবে আরসে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, কিন্তু এতে রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই ঘাটতি হবে না অর্থাৎ রোজাদারের সওয়াব কমবে না।
এরূপ সওয়াব আল্লাহতায়ালা এমন ব্যক্তিকে দেবেন, যে শুধু এক পেয়ালা দুধ অথবা একটি খেজুর বা সামান্য পরিমাণ পানি দ্বারাও কাউকে ইফতার করাবে। আর যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে তৃপ্তি মিটিয়ে খাওয়াবে আল্লাহ তাকে হাউজে কাওসারথেকে এমন শরবত পান করাবেন যাতে সে কখনও তৃষিত হবে না। এভাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বায়হাকি)
সাহাবীরা বলেন, হে আল্লাহর রসূল (স.) আমাদের এমন সংস্থান নেই যা দিয়ে আমরা কাওকে ইফতার করাতে পারি? তিনি (স.) বলেন, আল্লাহ তাকেও এই সওয়াব দেবেন, যে ব্যক্তি কোন রোজা পালনকারীকে এক ঢোক দুধ অথবা একটা শুকনো খেজুর কিংবা এক চুমুক পানি দিয়েও ইফতার করাবে আর যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে পরিতৃপ্তি সহকারে খাওয়াবে আল্লাহ তাকে আমার “হাউজে কাওছার” থেকে এমন ভাবে পানি পান করাবেন যার ফলে, সে জান্নাতে না পৌছানো পর্যন্ত আর তৃষ্ণার্ত হবে না। ( বায়হাকী ওয়াবুল ঈমান, মেশকাত ১৭৪ পৃষ্ঠা) ।
আল্লাহর রসুল (স.) বলেন: লোকেরা ততক্ষণ কল্যাণে থাকবে যতক্ষণ তারা ইফতার জলদি করবে। (বুখারী, মুসলিম ১ খণ্ড-৩২১ পৃঃ মিশকাত ১৭৫ পৃঃ)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় সেই বান্দা যে ইফতার সঠিক সময়ে করে। (তিরমিযী ১ম খণ্ড, ৮৮ পৃঃ, মেশকাত ১৭৫ পৃঃ) ।  এ হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে, ইফতারের নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরী করা মোটেই উচিত নয়।
যদি কেউ ইচ্ছা করে ইফতারে দেরী করে তাহলে সে রসূলুল্লাহ (স.) এর নির্দেশ অনুযায়ী কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে এবং আল্লাহর নিকট অপ্রিয় হবে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।
আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফ (রা.) বলেন, একবার আমরা (রমজানে) আল্লাহর রসূল (স.) এর সাথে সফরে ছিলাম (তখন তিনি রোজা অবস্থায় ছিলেন) অতঃপর (সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর) তিনি একজন সাহাবীকে বললেন, নামো এবং আমার জন্য ছাতু গুলে দাও।
সাহাবী (সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর) লালিমা দেখে বলল, হে আল্লাহর রসূল (স.) ঐ যে সূর্য (দেখা যায়) তিনি (তাঁর কথায় কান না দিয়ে) আবার বললেন, তুমি নামো এবং আমার জন্য ছাতু গোল। এভাবে তিন বার বললেন। অতঃপর তিনি (বেলাল রা.) নামলেন এবং রসূলুল্লাহ (স.) এর জন্য ছাতু গুললেন। তিনি তা পান করলেন। তারপর তিনি পূর্ব দিকে ইশারা করে বললেন, যখন তোমরা দেখবে যে, রাত ঐ দিক থেকে আসছে তখন বুঝবে সিয়াম পালনকরীর ইফতারের সময় হয়ে গেছে (বুখারী ২৬০ পৃঃ মুসলিম ১ম খণ্ড ৩৫১ পৃঃ)।

রমজানে সাহরির ফজিলত ও গুরুত্বঃ

রাসুল (সা.) সাহরি বা সেহেরি খেতে আদেশ করেছেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।
সাহরিতে বরকত এবং ফজিলত রয়েছে। আর তাই রাসুল (সা.) কখনো সাহরি থেকে বিরত থাকতেন না। সাহাবায়ে কেরামকেও সাহরির ব্যাপারে তাগিদ দিতেন এবং নিজের সঙ্গে শরিক করতেন।
রাসুল (সা.) এর কাছে একজন সাহাবী এলেন যখন তিনি সাহরী খাচ্ছিলেন। রাসুল (সা.) তাকে দেখে বললেন, এ খাবার বরকতের। আল্লাহ পাক বিশেষভাবে তোমাদের তা দান করেছেন। কাজেই তোমরা সাহরি খাওয়া ছেড়ে দিও না। (নাসাঈ)
তাবারানী শরীফের সূত্রে হযরত আনাস (রা.) এর বর্ণনায় রাসুল (সা.) বলেছেন, তিনটি জিনিসে বরকত রয়েছে। জামাআতে, সারিদ এবং সাহরিতে।
মুসলিম শরীফের সূত্রে হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আমাদের এ সিয়াম ও আহলে কিতাবদের (ইহুদী ও খৃষ্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হল সাহরি খাওয়া।
সাহরিকে বরকত বলার আরেকটি কারণ হল, সাহরি খাওয়ার ফলে দিনভর ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি শরীরে সঞ্চিত থাকবে। সাহরিবিহীন রোজার বিধান দেওয়া হলে তা অনেকের জন্য কষ্টকর হয়ে যেত। যেহেতু ইসলাম কোনো ধরনের কষ্টকর বিষয় কারো ওপর চাপিয়ে দিতে ইচ্ছুক নয়, তাই রোজার শুরুতে এ সাহরির বিধান এবং একে বরকতের আহার বলা হয়েছে।
আবার এর আরও একটি ফজিলত হল, সাহরি খাওয়াকে উপলক্ষ করে মুসলমানরা এমন সময়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন যা অতি মূল্যবান সময় ও মুহূর্ত হিসেবে গণ্য। রাতের এ শেষাংশে আল্লাহ পাক দুনিয়ার আকাশ থেকে ডেকে ডেকে বলেন, কেউ কি আছে আমায় ডাকছে? আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কেউ কি আছে আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে, আমি তাকে মাফ করে দেবো। এভাবে ভোর পর্যন্ত তিনি অবিরত ডেকে যান বান্দাদের। তাই সাহরির এ সময়টুকু অনেক বরকতপূর্ণ। সাহরির আগে পরে সামান্য সময়ের জন্য হলেও বান্দা হাত তুলে আল্লাহকে ডাকবে এবং তিনি এ ডাকে সাড়া দেবেন।
সাহরি খাওয়ার এ বিধান আল্লাহ পাকের তরফ থেকে বান্দার জন্য রহমত ও ভালোবাসার নিদর্শন। আল্লাহ পাক চাইলে সাহরিবিহিন লাগাতার রোযার হুকুম দিতে পারতেন। আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতা দেখে তিনি আমাদের সুযোগ দিয়েছেন সাহরি খেয়ে বাকি সময়টুকু সংযমে টিকে থাকার জন্য।
সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেসব মুসলমান ভোরের এ সময়ে জেগে আল্লাহ পাকের হুকুম মেনে সাহরি খেতে বসে, আল্লাহ পাক খুশি হয়ে তাদের জন্য বিশেষ রহমত অবতীর্ণ করেন এবং মহান আল্লাহর ফেরেশতারা সাহরি গ্রহণকারীদের জন্য বিশেষ দোয়া করতে থাকেন। মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় এর বিবরণ রয়েছে।
দেশ ও অঞ্চলভেদে সাহরিতে খাবারের ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। তবুও রাসুল (সা.) সাহরির সময় খেজুরকে সর্বোত্তম খাদ্যদ্রব্য বলেছেন। আবু দাঊদ শরীফের বর্ণনায় খেজুরকে সর্বোত্তম সাহরি বলেছেন রাসুল (সা.), এজন্য সাহরির সময় দু-একটি খেজুর খেলে এ সুন্নত আদায় হবে। এছাড়া আধুনিককালের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মতে খেজুরের ভেতর যে শক্তি ও পুষ্টিগুণ রয়েছে তা রোজাদারের জন্য অনেক বেশি শক্তিদায়ক এবং বিশেষ উপকারী।

রোজার নিয়ত ও রোজা ভঙ্গের কারণ সমুহঃ

রোজা ভঙ্গের কারণ সমুহঃ

১. ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে।
২. স্ত্রী সহবাস করলে ।
৩. কুলি করার সময় হলকের নিচে পানি চলে গেলে (অবশ্য রোজার কথা স্মরণ না থাকলে রোজা ভাঙ্গবে না)।
৪. ইচ্ছকৃত মুখভরে বমি করলে।
৫. নস্য গ্রহণ করা, নাকে বা কানে ওষধ বা তৈল প্রবেশ করালে।
৬. জবরদস্তি করে কেহ রোজা ভাঙ্গালে ।
৭. ইনজেকশান বা স্যালাইরনর মাধ্যমে দেমাগে ওষধ পৌছালে।
৮. কংকর পাথর বা ফলের বিচি গিলে ফেললে।
৯. সূর্যাস্ত হয়েছে মনে করে ইফতার করার পর দেখা গেল সুর্যাস্ত হয়নি।
১০. পুরা রমজান মাস রোজার নিয়ত না করলে।
১১. দাঁত হতে ছোলা পরিমান খাদ্য-দ্রব্য গিলে ফেললে।
১২. ধূমপান করা, ইচ্ছাকৃত লোবান বা আগরবাতি জ্বালায়ে ধোয়া গ্রহন করলে।
১৩. মুখ ভর্তি বমি গিলে ফেললে ।
১৪. রাত্রি আছে মনে করে সোবহে সাদিকের পর পানাহার করলে।
১৫. মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে পড়ে সুবহে সাদিকের পর নিদ্রা হতে জাগরিত হওয়া এ অবস্থায় শুধু কাজা ওয়াজিব হবে।
আর যদি রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামী-স্ত্রী সহবাস অথবা পানাহার করে তবে কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হবে। কাফফারার মাসআলা অভিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের থেকে জেনে নেবে।

রোজার মাকরুহগুলোঃ


* অনাবশ্যক কোনো জিনিস চিবানো বা চাখা
* কোনো দ্রব্য মুখে দিয়ে রাখা
*গড়গড় করা বা নাকের ভেতর পানি টেনে নেয়া কিন্তু পানি যদি নাক দিয়ে গলায় পৌঁছে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে
* ইচ্ছাকৃত মুখে থুথু জমা করে গলাধঃকরণ করা
* গীবত, গালা-গালি ও ঝগড়া-ফাসাদ করা। কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া-ফাসাদ করতে এলে বলবে, আমি রোজাদার তোমাকে প্রত্যুত্থর দিতে অক্ষম
* সাড়া দিন নাপাক অবস্থায় থাকা। এটি অত্যন্ত গুনাহের কাজ
* অস্থিরতা ও কাতরতা প্রকাশ করা
* কয়লা চিবিয়ে অথবা পাউডার, পেস্ট ও মাজন ইত্যাদি দ্বারা দাঁত পরিষ্কার করা

যেসব কারণে রোজা না রাখলে ক্ষতি নেই তবে কাযা আদায় করতে হবেঃ

*    কোনো অসুখের কারণে রোযা রাখার শক্তি হারিয়ে ফেললে অথবা অসুখ বৃদ্ধির ভয় হলে। তবে পরে তা কাযা করতে হবে।
*   গর্ভবতী স্ত্রী লোকের সন্তান বা নিজের প্রাণ নাশের আশঙ্কা হলে রোজা ভঙ্গ করা বৈধ তবে কাযা করে দিতে হবে।
*   যেসব স্ত্রী লোক নিজের বা অপরের সন্তানকে দুধ পান করান রোজা রাখার ফলে যদি দুধ না আসে তবে রোজা না রাখার  অনুমতি আছে কিন্তু পরে কাযা আদায় করতে হবে।
*   শরিয়তসম্মত মুসাফির অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি আছে। তবে রাখাই উত্তম।
*    কেউ হত্যার হুমকি দিলে রোযা ভঙ্গের অনুমতি আছে। পরে এর কাযা করতে হবে।
*    কোনো রোগীর ক্ষুধা বা পিপাসা এমন পর্যায়ে চলে গেল এবং কোনো দ্বীনদার মুসলিম চিকিৎসকের মতে রোজা ভঙ্গ না করলে তখন মৃত্যুর আশঙ্কা আছে। তবে রোযা ভঙ্গ করা ওয়াজিব। পরে তা কাযা করতে হবে।
*   হায়েজ-নেফাসগ্রস্ত (বিশেষ সময়ে) নারীদের জন্য রোজা রাখা জায়েজ নয়। পরবর্তীতে কাযা করতে হবে।

রোজার নিয়তঃ

নাওয়াইতু আন আছুমাগাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদ্বল্লাকা ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নীকা আন্তাস সামিউল আলীম।

ইফতারির দোয়াঃ

আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া তাওয়াক্কালতু আলা রিজক্কিকা আফতারতু বি-রহমাতিকা ইয়া আরহামার রহিমীন।
আসুন ভাই আমরা সবাই রমজানের রোজা রাখি এবং রমজানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহন করি।
(আমীন)

রমজান মাস সম্পর্কিত কিছু হাদিসঃ

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
আল্লাহ তাআলার কসম! মুসলমানদের জন্য রমযানের চেয়ে উত্তম কোনো মাস আসেনি এবং মুনাফিকদের জন্য রমযান মাসের চেয়ে অধিক ক্ষতির মাসও আর আসেনি। কেননা মুমিনগণ এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি অন্বেষণ করে। এ মাস মুমিনের জন্য গনীমত আর মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৮৩৬৮, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদীস-৮৯৬৮, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস-১৮৮৪, তাবারানী হাদীস-৯০০৪, বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান, হাদীস-৩৩৩৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين.
যখন রমযান মাসের আগমন ঘটে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।-সহীহ বুখারী, হাদীস-১৮৯৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস-১০৭৯ (১), মুসনাদে আহমদ হাদীস-৮৬৮৪, সুনানে দারেমী, হাদীস-১৭৭৫


হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রোযা এবং কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানো থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন দু’জনের সুপারিশই গ্রহণ করা হবে।-মুসনাদে আহমদ হাদীস : ৬৫৮৯; তবারানী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/৪১৯


হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন,
من افطر يوما من رمضان متعمدا من غير سفر ولا مرض لم يقضه ابدا، وان صام الدهر كله، … وقد ذكره البخاري تعليقا بصيغة الجزم حيث قال : وبه قال ابن مسعود، وقال الشيخ محمد عوامه : وهذا الحديث موقوف لفظا ومرفوع حكما
যে ব্যক্তি অসুস্থতা ও সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের একটি রোযাও ভঙ্গ করে, সে আজীবন রোযা রাখলেও ঐ রোযার হক আদায় হবে না।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯৮৯৩; মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস : ৭৪৭৬; সহীহ বুখারী ৪/১৬০
হযরত আলী রা. বলেন-
من افطر يوما من رضمان متعمدا لم يقضه أبدا طول الدهر.
যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবে, সে আজীবন সেই রোযার (ক্ষতিপূরণ) আদায় করতে পারবে না।- মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৯৮৭৮

রোযার হালতে গীবত করলে, গালি-গালাজ করলে, টিভি-সিনেমা ইত্যাদি দেখলে, গান-বাদ্য শ্রবণ করলে এবং যে কোনো বড় ধরনের গুনাহে লিপ্ত হলে রোযা মাকরূহ হয়ে যায়। আর এ কাজগুলো যে সর্বাবস্থায় হারাম তা তো বলাই বাহুল্য।
হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- اذا كان يوم صوم احدكم فلا يرفث ولا يصخب ‘তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখে তখন সে যেন অশালীন কথাবার্তা না বলে ও হৈ চৈ না করে। -সহীহ বুখারী হাদীস : ১৯০৪;

মাহে রমজান আজ শুরু

.



রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে বছর ঘুরে আবার এল পবিত্র মাহে রমজান। বাংলাদেশের আকাশে গতকাল সোমবার হিজরি ১৪৩৭ সালের রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গতকাল ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের আকাশে রমজান মাসের চাঁদ দেখা গেছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে আগামী ২ জুলাই দিবাগত রাতে পবিত্র লাইলাতুল কদর পালিত হবে।

রমজান মাসের চাঁদ দেখার পর থেকেই ঘরে ঘরে রোজার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। মসজিদগুলোতে এশার নামাজের পরে প্রথম তারাবির জামাত আদায় করা হয়েছে। শেষ রাতে সাহরি খেয়ে রোজা রেখেছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। এই মাসে প্রতিদিন সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দিবাভাগে পানাহারবঞ্চিত থেকে সংযমের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি করে মহান আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ কামনা করবেন তাঁরা। রমজান মাস পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস। সে কারণে রোজা রাখার পাশাপাশি বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ আদায়, জিকির-আজকার ও দান-খয়রাতের মাধ্যমে বিগত জীবনের পাপতাপ মুক্তির জন্য দোয়াও করবেন। বরকতময় এই মাসে আল্লাহ পাকের রহমত ও ক্ষমা লাভের জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকেন।

স্বাগত মাহে রমজান

অলংকরণ: তুলিঅলংকরণ: তুলি
হিজরি চান্দ্রবর্ষের নবম মাসের আরবি নাম রমাদান। ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা উচ্চারণে এটি হয় রমজান। রমাদান বা রমজান শব্দের অর্থ হলো প্রচণ্ড গরম, সূর্যের খরতাপে পাথর উত্তপ্ত হওয়া, সূর্যতাপে উত্তপ্ত বালু বা মরুভূমি, মাটির তাপে পায়ে ফোসকা পড়ে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, ঝলসে যাওয়া, কাবাব বানানো, ঘাম ঝরানো, চর্বি গলানো, জ্বর, তাপ ইত্যাদি। রমজানে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় রোজাদারের পেটে আগুন জ্বলে; পাপতাপ পুড়ে ছাই হয়ে রোজাদার নিষ্পাপ হয়ে যায়; তাই এ মাসের নাম রমজান। (লিসানুল আরব)।
রমজানের পূর্বপ্রস্তুতিহজরত উম্মে সালমা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস, রমজান আমার উম্মতের মাস।’ হজরত আয়িশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, যারা রজব মাসে ভূমি কর্ষণ করল না, শাবান মাসে বীজ বপন করল না, তারা রমজান মাসে (ইবাদত ও পুণ্যের) ফসল তুলতে পারবে না।’ নবীজি (সা.) সাধারণত রজব মাসে ১০টি নফল রোজা রাখতেন, শাবান মাসে ২০টি নফল রোজা রাখতেন; যাতে রমজানে ৩০টি রোজা অনায়াসে রাখা যায়। রজব ও শাবান মাসে নবী করিম (সা.) বেশি বেশি নফল নামাজ পড়তেন। নবী-পত্নী উম্মুল মুমিনীনগণ বলেন, রজব মাস এলে আমরা বুঝতে পারতাম নবীজি (সা.)–এর ইবাদত-বন্দেগির আধিক্য দেখে।

রাসুল (সা.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে রোজা রাখবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়বে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের নিয়তে শবে কদরে ইবাদত করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
রমজানে ওষুধ সেবন
রমজানের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি অন্যতম। রোজা পালন ও তারাবির নামাজ আদায়ের জন্য এই উভয় প্রকার প্রস্তুতি খুবই প্রয়োজনীয়। যাঁরা নিয়মিত বিভিন্ন ওষুধ সেবন করেন, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ গ্রহণের সময়সূচি নির্ধারণ করে নেবেন। যাঁদের শারীরিক ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করতে হয়, তাঁদেরও সেই উপযুক্ত সময় নির্দিষ্ট করে নিতে হবে।
রমজানে প্রয়োজন হালাল ও পুষ্টিকর খাবার
রমজানে হালাল খাদ্যের আয়োজন করতে হবে; ভারসাম্যপূর্ণ পুষ্টিকর খাবারের বিষয়টিও লক্ষ রাখতে হবে। ইফতার ও সেহরির সুন্নত পালন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি যত্নবান থাকতে হবে, যাতে ইবাদতের অসুবিধা না হয়। ইবাদতের অনুকূল ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ সুন্নতি লেবাসের প্রতি মনোযোগী হতে হবে।
স্বাগত রমজান
রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখো।’ (মুসলিম)। নবী করিম (সা.) এভাবে রমজানকে স্বাগত জানাতেন: ‘হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং রমজান আমাদের নসিব করুন।’ (বুখারি)।
রমজানের চাঁদ দেখা
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ছাড়ো (ঈদ করো)।’ (বুখারি ও মুসলিম)। তাই চাঁদ দেখা সুন্নত; এটি ইবাদতের প্রতি অনুরাগ ও ভালোবাসার প্রতীক। নতুন চাঁদকে হিলাল বলে। প্রথম তিন দিনে হিলাল বা নতুন চাঁদ দেখলে এই দোয়া পড়া সুন্নত: ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ইমান, ওয়াছ ছালামাতি ওয়াল ইসলাম, রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ; হিলালু রুশদিন ওয়া খায়র।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! এই মাসকে আমাদের জন্য নিরাপত্তা, ইমান, প্রশান্তি ও ইসলাম সহযোগে আনয়ন করুন; আমার ও তোমার প্রভু আল্লাহ। এই মাস সুপথ ও কল্যাণের।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৫১, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪০০, রিয়াদুস সালেহীন: ১২৩৬)।
রমজানে ইবাদতের প্রস্তুতি
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ অতি অবশ্যই মসজিদে জামাতে পড়ার চেষ্টা করতে হবে। তারাবির নামাজ জামাতে পড়ার জন্য যথাসময়ে মসজিদে যাওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি থাকতে হবে। খতমে তারাবি পড়া সবচেয়ে উত্তম। ইবাদতের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে কাজকর্মের রুটিন পরিবর্তন করে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। রমজানের পাঁচটি সুন্নত পালনে সচেষ্ট থাকতে হবে। যথা: (১) সেহরি খাওয়া, (২) ইফতার করা, (৩) তারাবির নামাজ পড়া, (৪) কোরআন তিলাওয়াত করা, (৫) ইতিকাফ করা। যাঁরা কোরআন তিলাওয়াত জানেন না, তাঁরা শেখার চেষ্টা করবেন। যাঁরা তিলাওয়াত জানেন, তাঁরা শুদ্ধ করে তিলাওয়াত করার চেষ্টা করবেন। যাঁরা বিশুদ্ধ তিলাওয়াত জানেন, তাঁরা অর্থ বোঝার চেষ্টা করবেন। যাঁরা তরজমা জানেন, তাঁরা তাফসির অধ্যয়ন করবেন। সাহাবায়ে কেরাম সাধারণত প্রতি সপ্তাহে
এক খতম (পূর্ণ কোরআন করিম তিলাওয়াত সম্পন্নকরণ) করতেন—এভাবে প্রতি মাসে অন্তত চার খতম হয়ে যেত। আবার সেই সব সাহাবাই দীর্ঘ এক যুগ ধরে মাত্র একটি সুরা গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন।
রমজানের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত হলো ইতিকাফ। রমজানের শেষ দশক ইতিকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাহ কিফায়া। এর কম সময় ইতিকাফ করলে তা নফল হিসেবেই গণ্য হবে। পুরুষেরা মসজিদে ইতিকাফ করবেন। নারীরাও নিজ নিজ ঘরে নির্দিষ্ট কক্ষে ইতিকাফ করতে পারবেন। রমজানের বিশেষ তিনটি আমল হলো: (১) কম খাওয়া, (২) কম ঘুমানো, (৩) কম কথা বলা। হারাম থেকে বেঁচে থাকা; চোখের হেফাজত করা, কানের হেফাজত করা, জবানের হেফাজত করা।
রমজানের লক্ষ্য হাসিলের চেষ্টা করা
রমজান হলো তাকওয়া অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের মাস। তাকওয়া অর্জনই রমজানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন: ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি; আশা করা যায় যে তোমরা তাকওয়া অর্জন করবে।’ (সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াত)। আল্লাহ চান তাঁর বান্দা তাঁর গুণাবলি অর্জন করে সেই গুণে গুণান্বিত হোক। আল্লাহ তাআলা কোরআন মজিদে বলেন: ‘আল্লাহর রং! আর আল্লাহর রং অপেক্ষা চমৎকার কোনো রং হতে পারে?’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩৮)। হাদিস শরিফে আছে: ‘তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও।’ (মুসলিম)। যেহেতু মানুষ আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি, তাই তাকে খেলাফতের দায়িত্ব পালনের যোগ্য হতে হলে অবশ্যই সেসব গুণাবলি অর্জন করতে হবে।
আল্লাহর রং বা গুণ কী? তা হলো আল্লাহ তাআলার ৯৯টি গুণবাচক নাম। এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে এসেছে: ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলার ৯৯টি নাম রয়েছে, যারা এগুলো আত্মস্থ করবে; তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুসলিম ও তিরমিজি)। মহান আল্লাহর নামাবলি আত্মস্থ বা ধারণ করার অর্থ হলো সেগুলোর ভাব ও গুণ অর্জন করা এবং সেসব গুণা ও বৈশিষ্ট্য নিজের কাজকর্মে, আচরণে প্রকাশ করা তথা নিজেকে সেসব গুণের আধার বা অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলা। রমজান হলো তাকওয়ার প্রশিক্ষণ। লক্ষ্য হলো রমজানের বাইরের বাকি এগারো মাস রমজানের মতো পালন করার সামর্থ্য অর্জন করা, দেহকে হারাম খাদ্য গ্রহণ ও হারাম কর্ম থেকে বিরত রাখা এবং মনকে অপবিত্র চিন্তাভাবনা, হারাম কল্পনা ও পরিকল্পনা থেকে পবিত্র রাখা।