“সাস লিপি”, যা দিয়ে পৃথিবীর সব ভাষা লেখা যায়

  • বর্তমানে সমাজ ও সংস্কৃতি নতুন প্রতিবেদনগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

 ভূমিকা : 

ইউনিফাইড স্ক্রিপ্ট বা সমন্বিত লিপি হচ্ছে  এমন একটি লিপি যা দিয়ে পৃথিবীর সব ভাষা লেখা সম্ভব ।সমন্বিত লিপি আবিষ্কার পৃথিবীর প্রখ্যাত ভাষাবিদদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন।  ত্রয়োদশ শতাব্দীতে শাসক কুবলাই খান একজন তিব্বতী লামাকে ঐ সময়ে তিব্বত ও তার আশে পাশের অঞ্চলে প্রচলিত ভাষাগুলি লেখার উপযোগী একটিমাত্র লিপি উদ্ভাবনের দায়িত্ব প্রদান করেন। এই লামা যে লিপি উদ্ভাবন করেন তার নামে পাগস্‌ পা ( লিঙ্কhttp://babelstone.blogspot.com) বলাবাহূল্য, সঙ্গতঃ কারনেই এই লিপি জনপ্রিয় হয়নি। এর পর হাজার হাজার পন্ডিত ব্যাক্তি উন্নততর সমন্বিত লিপি আবিষ্কারের চেষ্টা করেন ।  ভিতেলী ভিতেশ নামে একজন রাশিয়ান শিল্পী দীর্ঘ ২২ বৎসর পরিশ্রম করে ১৯৯৭ সালে ইন্টারব্রেট (লিঙ্কঃ   :http://www.astrolingua.spb.ru/ ENGLISH/ inter_eng.htm and  semiravet@yandex.ru) নামে একটি সমন্বিত লিপি আবিষ্কার করেন এবং দাবী করেন যে, তার লিপির সাহায্যে পৃথিবীর সকল ভাষা লেখা সম্ভব।  বাস্তব সত্য এই যে, তাদের লিপিও জনপ্রিয় হয়নি।

২০০৯ সালের ২৪শে নভেম্বর সাস সমন্বিত লিপি আবিষ্কৃত হয় । এই তারিখে এটি ক্যানাডা ও আমেরিকার  ট্রাফোর্ড পাবলিশিং থেকে ‘SUS FOR WRITING MULTIPLE LANGUAGES’ (ISBN: 978-1-4269-0939-9,  লেখক ঃ ডাঃ মীরা রানী শর্মা পারই ও অধ্যাপক বিজন বিহারী শর্মা) নামে একটি কপিরাইটকৃত পুস্তকে প্রকাশিত য় ।  এর পর ২০১০ এর জুলাই মাসে প্রিয় অষ্ট্রেলিয়া ডট কম-এ এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় (লিঙ্কঃ  www.priyo-australia,.au / Articles/ Bangladeshi Scholars Invented Unified Scripts to Write All the Languages of the World) । একই সালের ১৯ শে জুলাই অষ্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা রেডিও থেকে এ বিষয়ে একটি বেতার সাক্ষাৎকার প্রচরিত হয়, যা এই লিঙ্কটি ব্যবহার করে শোনা যেতে পারেঃ http://www.banglaradio.org.au/BR-Archive-2010-Summary.htm  এর পর আগষ্ট ২০১০ এ জার্মানী থেকে প্রকাশিত হয়  "SUS", THE LATEST UNIFIED SCRIPT(ISBN 978-3-8383-7411-6 অধ্যাপক বিজন বিহারী শর্মা ও ডাঃ মীরা রানী শর্মা পারই ) 

সাস এর পূর্ণরূপ শর্মা'স ইউনিফাইড স্ক্রীপ্ট । শর্মা এই লিপির আবিষ্কারকদের পারিবারিক উপাধি । আগে আবিষ্কৃত সকল সমন্বিত লিপিকারদের মতই সাসলিপির এই উদ্ভাবকগণও দাবী করছেন যে এরমাধ্যমে পৃথিবীর সকল ভাষা লেখা সম্ভব । এই দাবীর সত্যতা প্রমানে সময়ের প্রয়োজন । বাংলাভাষা লেখার ক্ষেত্রে এখন যেসব সমস্যা আছে, সাসলিপির সাহায্যে লেখা হলে তার অধিকাংশই থাকবে না বলে এই উদ্ভাবকগণ দাবী করেছেন ।

সাসলিপি কেন ?
সঙ্গতঃ কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে, পূর্বে আবিষ্কৃত একটি সমন্বিতলিপিও জনপ্রিয় না হবার পরেও সাসলিপির আবিষ্কারকদের আশান্বিত হবার কারন কি ? এ প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই আলোচনা করা যাক, কেন পূর্বে আবিষ্কৃত সমন্বিত লিপিগুলি জনপ্রিয় হয়নি ।

সমন্বিতলিপির পূর্বের সকল আবিস্কারকই লিপি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে প্রধানতঃ একটি পন্থা অবলম্বন করেছেন। এটি হল, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত বর্ণের মধ্যে যেগুলির উচ্চারণ একই বা একই রকম(যেমন ঃ বাংলা , ইংরেজী k  এবং আরবী কাফ), সেগুলিকে চিহ্নিত করা এবং  তারপর এইবর্ণগুলি লেখার জন্য পুরানো বা নতুন কোন চিণ্হ বা হরফ ব্যবহার করা।

এই প্রচেষ্টা দুটি প্রধান সমস্যা আছে । প্রথমতঃ বিভিন্ন ভাষার বর্ণমালায় ঠিক একই উচ্চারনের বর্ণের সংখ্যা নগন্য । আবার সমোচ্চারিত বা প্রায় সমোচ্চারিত কিছু বর্ণ থাকলেও ব্যবহারের স্থানভেদে তাদের উচ্চার বদলে যায় । যেমন, বাংলা , ইংরেজী k বা c এবং আরবী কাফ এর প্রকৃত উচ্চার সব সময় এক নয়। এর ফলে একটি মাত্র লিপির সাহায্যে বিভিন্ন ভাষার বর্ণ উচ্চার করতে গেলে তা কোনএকটি ভাষায় ঠিক থাকলেও অন্য ভাষায় বিকৃত হয়ে যায় । তাই এই নিয়মে লিপি ব্যবহার করা হলে ভাষা তার পূর্বের উচ্চারন হারায় । মানুষ কোনভাবেই চায় না যে তার ভাষা বিকৃত হোক । বাংলাদেশে এই ভাষার জন্য মানুষ জীবন বিসর্জন দিয়েছে । 

দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে, ভাষা লেখার যে লিপিগুলি আমরা ব্যবহার করি তা কোন বিজ্ঞানসম্মত চেষ্টার ফসল নয়, একথা সবারই জানা আছে । প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মূলত চেষ্টা ও সংশোধনীর মাধ্যমে এগুলি গড়ে উঠেছে । অনেক ক্ষেত্রেই এগুলি লেখা বেশ কষ্টকর, সময়সাপেক্ষ এবং ভালো করে না লিখলে পাঠোদ্ধারও অসম্ভব । কিন্তু তা স্বত্তেও কেউ যখন ঐ লিপির বদলে অন্য কোন লিপি লেখার প্রস্তাব নিয়ে আসবে, তখন স্বাভাবিক কারনেই মানুষ বলবে, অনেক কষ্ট করে এগুলো লেখা আয়ত্ব করেছি, এখন তা কেন বদল করবো ? তবে এ কথা সত্য যে তা তারা করতে রাজী হবে যদি নতুন লিপির কোন বিশেষ সুবিধা বা গুণ থাকে  


সাসলিপির বৈশিষ্ট্যঃসাস কোন পূর্ণাঙ্গ ভাষা নয়, এটি একটি লিপি । এই লিপির নিজস্ব কোন উচ্চারন নেই, বরং যে ভাষা লিখতে সাস লিপি ব্যবহার করা হয় লিপিগুলি সেই ভাষার বর্ণগুলির প্রচলিত উচ্চারণ গ্রহন করে । এর ফলে ভাষার কথ্যরূপটি একেবারে অবিকৃত থাকে, কেবলমাত্র তার লিখিত রূপটি বদলে যায় । পূর্বে আবিষ্কৃত সমন্বিত লিপিগুলি যেখানে লিপি নির্ধারন করতো উচ্চারণের মিলের উপর ভিত্তি করে, সেখানে সাসলিপিতে লিপি নির্ধারণ করা হয় বর্ণমালায় প্রতিটি বর্ণের গানিতিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে ।   
এখন আমরা সাসলিপির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলি বর্ণনা করবো ।
।    সাসলিপির বর্ণগুলি একটি অত্যন্ত সহজ নিয়ম বা মূলসূত্র অনুসরন করে তৈরী করা হয়েছে । ই সূত্রটি এত সোজা যে কোন শিশুকে তা বুঝিয়ে দিলে সে নিজেই বর্ণগুলি পর পর তৈরী করে নিতে পারে 
।   সাসলিপির বর্ণগুলি সিম্বল বা আকার এর পরিবর্তে শুধুমাত্র সোজা দাগ (STROKE) দিয়ে তৈরী, যেখানে কোনাকুনি যাওয়া, বাঁকানো, প্যাঁচানো, এক দাগের উপর দিয়ে আবার দাগ দেয়া, পেছনে এসে বর্ণের উপরে/ নীচে/ আগে/ পরে চিহ্ন দেয়া, এসব কিছুই নেই । ফলে লিপিগুলি অত্যন্ত সহজে এবং  দ্রুত লেখা যায় । আবার ব্যক্তির ভিন্নতার কারণে লিখিত লিপি পাঠে ভুল বোঝাবুঝির(CONFUSION) সম্ভাবনাও থাকে না । একই কারনে ব্যক্তিভেদে হাতের লেখা ভাল বা মন্দ হবারসম্ভাবনাও কমে যায় ।   অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাত্র ২,  বা ৪টি দাগ (চিত্র-১) দিয়ে লিপিগুলি তৈরী করা হয়েছে বলে এগুলি লেখা ও চেনা অত্যন্ত সহজ । সাধারন ভাবে যে সব ভাষা শুধুমাত্র বর্ণের মাধ্যমে লেখা হয় তা লেখার জন্য ৪টি এবং যে সব ভাষায় বর্ণ ও বর্ণচিহ্ন ব্যবহৃত হয়, তাদের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ টি স্ট্রোকের প্রয়োজন হয়।।   কম সংখ্যক স্ট্রোক দিয়ে তৈরী বলে এগুলি টাইপ করার জন্য স্বল্পসংখ্যক চাবি (KEY) লাগে  সাসলিপি তৈরীর মূলসূত্রঃসাসলিপি এমন একটি লিপি যা কয়েকটি মূলসূত্র জানার পর যে কেউ নিজেই তৈরী করে নিতে পারে । এই মূলসূত্রগুলি  হচ্ছে,১।    প্রতিটি হরফ একটি বর্গক্ষেত্রের মধ্যে বদ্ধ থাকবে, কোন চিহ্ণই এই র্গক্ষেত্রের বাইরে যাবে না ।
২।   প্রতিটি হরফে র্গক্ষেত্রের মাঝ বরাবর থাকবে একটি আনুভূমিক লাইন (১নং চিত্র, প্রথম লাইন)।
৩।    বিভিন্ন ভাষার বর্ণগুলির প্রতি ৫টিকে নিয়ে একটি গ্রুপ বা বর্গ তৈরী করা হবে । এর প্রথম বর্ণটি হবে বর্গ প্রধান । বাংলায় এটি প্রচলিত আছে । অন্য ভাষায়ও এভাবে ৫টির বর্গ তৈরী করায় কোন সমস্যা নেই ।
৪।    সাসলিপিতে প্রথমে বর্গপ্রধানগুলি তৈরী করা হবে । এ কাজে প্রথমে আনুভূমিক লাইন (১নং চিত্র,প্রথম লাইন) টি ব্যবহার করা হবে। এরপর উলম্ব অর্ধ-লাইন (১নং চিত্র, দ্বিতীয় লাইন) টি আনুভূমিক লাইনের নীচে বাম থেকে শুরু করে একে একে ২নং চিত্রে দেখানো ৪টি স্থানে ঘড়ির কাঁটার বরাবরে ঘুরে ঘুরে বর্গপ্রধানগুলি  তৈরী করবে । ২নং চিত্র দেখানো ৪টি স্থান হলো, (প্রথম)নিচে বামে, (দ্বিতীয়) উপরে বামে, (তৃতীয়) উপরে ডানে এবং (শেষে) নীচে ডানে  এই নিয়মে ১ টি বর্গ প্রধান তৈরী করা সম্ভব। ১৪টি বর্গ প্রধান থেকে (৫ X  ১৪ =) ৭০টি বর্ণের বর্ণমালা তৈরী করা যায় । কোন ভাষার বর্নসংখ্যা বেশী হলে প্রয়োজনে আরো ছোট উল্লম্ব লাইন ব্যবহার করে আরও ১ টি বর্গপ্রধান তৈরী করা যায়।
৫।    বর্গপ্রধান তৈরী করার পর প্রতিটি বর্গপ্রধান থেকে এই বর্গের অন্য বর্ণগুলি তৈরী করা হবে । এটি করার জন্যও একই নিয়ম অনুসরণ করা হবে । এক্ষেত্রে ছোট উলম্ব লাইন (১নং চিত্র, তৃতীয় লাইন) টি বর্গপ্রধানটির ৩নং চিত্রে দেখানো ৪ টি স্থানে ক্রমান্বয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরে ৪টি বর্ন তৈরী করবে । নী
চের ছবি দেখুন :



    Publisher : SK NUR SALAM

    Published : 19-11-2018

বাংলা ভাষা

  • বর্তমানে সমাজ ও সংস্কৃতি নতুন প্রতিবেদনগুলি পড়তে এখানে ক্লিক করুন


বাংলা ভাষা : দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলের মানুষের স্থানীয় ভাষা, এই অঞ্চলটি বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত। এছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকা এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও বাংলা ভাষাতে কথা বলা হয়। এই ভাষার লিপি হল বাংলা লিপি। এই অঞ্চলের প্রায় বাইশ কোটি স্থানীয় মানুষের ও পৃথিবীর মোট ৩০ কোটি মানুষের ভাষা হওয়ায়, এই ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলির মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। বাংলাদেশভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীত, এবং ভারতের জাতীয় স্তোত্রএই ভাষাতেই রচিত এবং তা থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় এই ভাষার গুরুত্ব বোঝা যায়।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত বাংলা ভাষার মধ্যে ব্যবহার, উচ্চারণ ও ধ্বনিতত্ত্বের সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে, বাংলা ও তার বিভিন্ন উপভাষা বাংলাদেশের প্রধান ভাষা এবং ভারতে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। এই ভাষা বাংলার নবজাগরণের ফলে সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নির্মাণ ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে এক সূত্রে গ্রথিত করেছে, শুধু তাই নয়, এই ভাষা বাঙালি জাতীয়তাবাদ গঠনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১৯৫১-৫২ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলন এই ভাষার সাথে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেছিল। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদী ছাত্র ও আন্দোলনকারীরা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলা ও লেখাপড়ার অধিকারের দাবীতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। মাতৃভাষার জন্য তাঁদের বলিদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

ইতিহাস

খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে মাগধী প্রাকৃত ও পালির মতো পূর্ব মধ্য ইন্দো-আর্য ভাষাসমূহ থেকে বাংলা ও অন্যান্য পূর্ব ইন্দো-আর্য ভাষাগুলির উদ্ভব ঘটে। এই অঞ্চলে কথ্য ভাষা প্রথম সহস্রাব্দে মাগধী প্রাকৃত বা অর্ধমাগধী ভাষায় বিবর্তিত হয়। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীর শুরুতে উত্তর ভারতের অন্যান্য প্রাকৃত ভাষার মতোই মাগধী প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশ ভাষাগুলির উদ্ভব ঘটে। পূর্বী অপভ্রংশ বা অবহট্‌ঠ নামক পূর্ব উপমহাদেশের স্থানীয় অপভ্রংশ ভাষাগুলি ধীরে ধীরে আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় বিবর্তিত হয়, যা মূলতঃ ওড়িয়া ভাষাবাংলা-অসমীয়া ও বিহারী ভাষাসমূহের জন্ম দেয়। কোনো কোনো ভাষাবিদ ৫০০ খ্রিস্টাব্দে এই তিন ভাষার জন্ম বলে মনে করলেও এই ভাষাটি তখন পর্যন্ত কোনো সুস্থির রূপ ধারণ করেনি; সে সময় এর বিভিন্ন লিখিত ও ঔপভাষিক রূপ পাশাপাশি বিদ্যমান ছিল। যেমন, ধারণা করা হয়, আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীতে মাগধী অপভ্রংশ থেকে অবহট্‌ঠের উদ্ভব ঘটে, যা প্রাক-বাংলাভাষাগুলির সঙ্গে কিছু সময় ধরে সহাবস্থান করছিল। 
চৈতন্য মহাপ্রভুর যুগে ও বাংলার নবজাগরণের সময় বাংলা সাহিত্য সংস্কৃত ভাষা দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিল। সংস্কৃত থেকে যে সমস্ত শব্দ বাংলা ভাষায় যোগ করা হয়, তাঁদের উচ্চারণ অন্যান্য বাংলা রীতি মেনে পরিবর্তিত হলেও সংস্কৃত বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়। বাংলা ভাষার ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেন বাংলার মুসলিম শাসকগোষ্ঠী। ফার্সির পাশাপাশি বাংলাও বাংলার সালতানাতের দাফতরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ছিলো এবং ব্যাপক হারে ব্যবহার হতো। এছাড়াও প্রোটো বাংলা ছিলো পাল এবং সেন সাম্রাজ্যের প্রধান ভাষা।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে নদিয়া অঞ্চলে প্রচলিত পশ্চিম-মধ্য বাংলা কথ্য ভাষার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক বাংলা সাহিত্য গড়ে ওঠে। বিভিন্ন আঞ্চলিক কথ্য বাংলা ভাষা ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ব্যবহৃত ভাষার মধে অনেকখানি পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক বাংলা শব্দভাণ্ডারে মাগধী প্রাকৃতপালিসংস্কৃতফার্সিআরবি ভাষা এবং অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষাসমূহ সহ অন্যান্য ভাষা পরিবারের শব্দ স্থান পেয়েছে।

চর্যাপদের একটি পৃষ্ঠা
বাংলা ভাষার ইতিহাসকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
  1. প্রাচীন বাংলা (৯০০/১০০০ – ১৪০০ খ্রিস্টাব্দ) — চর্যাপদ, ভক্তিমূলক গান এই সময়কার লিখিত নিদর্শন। এই সময় আমিতুমি ইত্যাদি সর্বনাম এবং -ইলা, -ইবা, ইত্যাদি ক্রিয়াবিভক্তির আবির্ভাব ঘটে।
  2. মধ্য বাংলা (১৪০০–১৮০০ খ্রিস্টাব্দ) — এ সময়কার গুরুত্বপূর্ণ লিখিত নিদর্শন চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ইত্যাদি। শব্দের শেষে "অ" ধ্বনির বিলোপ, যৌগিক ক্রিয়ার প্রচলন, ফার্সি ভাষার প্রভাব এই সময়ের সাহিত্যে লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো ভাষাবিদ এই যুগকে আদি ও অন্ত্য এই দুই ভাগে ভাগ করেন।
  3. আধুনিক বাংলা (১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে-বর্তমান) — এই সময় ক্রিয়া ও সর্বনামের সংক্ষেপণ ঘটে, যেমন তাহার → তারকরিয়াছিল → করেছিল
অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে, বাংলা ব্যাকরণ রচনার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভাওয়াল জমিদারীতে কর্মরত অবস্থায় পর্তুগিজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্য আসুম্পসাও সর্বপ্রথম ভোকাবোলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা, এ পোর্তুগুয়েজ ডিভিডিডো এম দুয়াস পার্তেস (পর্তুগিজVocabolario em idioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes) নামক বাংলা ভাষার অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন। ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামক এক ইংরেজ ব্যাকরণবিদবিদ আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ (ইংরেজিA Grammar of the Bengal Language) নামক গ্রন্থে একটি আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যেখানে ছাপাখানার বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। বাঙালি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায়  ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে গ্র্যামার অফ্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ্ (ইংরেজিGrammar of the Bengali Language) নামক একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন।
১৯৫১–৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জনগণের প্রবল ভাষা সচেতনতার ফলস্বরূপ বাংলা ভাষা আন্দোলন নামক একটি ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে পাকিস্তান সরকারের নিকট বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতি দাবী কর হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বহু ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন দিবস পালিত হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা প্রদান করে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ঘটে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ভারতের অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় একইরকম ভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলন সংগ ভাষা বঙ্গ অঞ্চলের বাঙালি অধিবাসীর মাতৃভাষা। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। এছাড়া ভারতের অসম রাজ্যের দক্ষিণাংশেও এই ভাষা বহুল প্রচলিত। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন।

সরকারি মর্যাদা

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় ভাষা ও সরকারি ভাষা হল বাংলা। এছাড়াও ভারতীয় সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। ভারতেরপশ্চিমবঙ্গঅসম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা হল বাংলা এছাড়াও বাংলা ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান ভাষা। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাস হতে বাংলা ভাষা ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা রূপে স্বীকৃত। পাকিস্তানের করাচী শহরের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা রূপে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজন কাব্বাহ ঐ রাষ্ট্রে উপস্থিত জাতিসংঘেরশান্তিরক্ষা বাহিনীর ৫,৩০০ বাংলাদেশী সৈনিকদের সেবার স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা ভাষাকে সরকারী ভাষার মর্যাদা প্রদান করেন।
নোবেলজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুইটি বাংলা কবিতা ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার দাবী জানান।

কথ্য ও সাহিত্যের ভাষার বিবিধতা

বাংলার কথ্য ও লেখ রূপের মধ্যে বিবিধতা বর্তমান। বিভিন্ন শব্দভাণ্ডার দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে বাংলায় দুই ধরণের লিখনপদ্ধতি তৈরী হয়েছে।
  1. সাধু ভাষা বাংলার এক ধরণের লেখ রূপ, যেখানে সংস্কৃত ও পালি ভাষাসমূহ থেকে উদ্ভূত তৎসম শব্দভাণ্ডার দ্বারা প্রভাবিত অপেক্ষাকৃত লম্বা ক্রিয়া বিভক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই ধরণের ভাষা বাংলা সাহিত্যে বহুল ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে সাহিত্যে এই ভাষারূপের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
  2. চলিতভাষা, যা ভাষাবিদদের নিকট মান্য চলিত বাংলা নামে পরিচিত, বাংলার এক ধরণের লেখ রূপ, যেখানে মানুষের কথ্য বাগধারা স্থান পায়। এই লিখন শৈলীতে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের ক্রিয়া বিভক্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে এই ধরণের শৈলী অনুসরণ করা হয়ে থাকে। উনবংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরে দুলাল প্রভৃতি রচনাগুলিতে এই ধরণের শৈলী সাহিত্যে জায়গা করে নেয়।[৩৪] এই শৈলী নদিয়া জেলার শান্তিপুর অঞ্চলে প্রচলিত কথ্য উপভাষা থেকে গঠিত হয়েছে, ফলে একে অনেক সময় শান্তিপুরী বাংলা বা নদিয়া উপভাষা বলা হয়ে থাকে।
মান্য চলিত বাংলায় অধিকাংশ বাংলা সাহিত্য রচিত হলেও, কথ্য বাংলা উপভাষাগুলির মধ্যে যথেষ্ট বিবিধতা রয়েছে। কলকাতা সহ দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীরা মান্য চলিত বাংলায় কথা বলে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলগুলির কথ্য ভাষা মান্য চলিত বাংলার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের কথ্য ভাষার সঙ্গে মান্য চলিত বাংলার খুব সামান্যই মিল রয়েছে।[৩৫] তবে অধিকাংশ বাঙালি নিজেদের মধ্যে ভাব আদানপ্রদানের সময় মান্য চলিত বাংলা সহ একাধিক উপভাষায় কথা বলতে সক্ষম বলে মনে করা হলেও অনেক ভাষাবিদ তা স্বীকার করেন না

অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে, বাংলা ব্যাকরণ রচনার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভাওয়াল জমিদারীতে কর্মরত অবস্থায় পর্তুগিজ মিশনারি পাদ্রি ম্যানুয়েল দ্য আসুম্পসাও সর্বপ্রথম ভোকাবোলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা, এ পোর্তুগুয়েজ ডিভিডিডো এম দুয়াস পার্তেস (পর্তুগিজVocabolario em idioma Bengalla, e Portuguez dividido em duas partes) নামক বাংলা ভাষার অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন।  ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামক এক ইংরেজ ব্যাকরণবিদবিদ আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ (ইংরেজিA Grammar of the Bengal Language) নামক গ্রন্থে একটি আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যেখানে ছাপাখানার বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। [৪] বাঙালি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে গ্র্যামার অফ্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ্ (ইংরেজিGrammar of the Bengali Language) নামক একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন।[২১]
১৯৫১–৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জনগণের প্রবল ভাষা সচেতনতার ফলস্বরূপ বাংলা ভাষা আন্দোলন নামক একটি ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনে পাকিস্তান সরকারের নিকট বাংলা ভাষার সরকারি স্বীকৃতি দাবী কর হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বহু ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী নিহত হন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন দিবস পালিত হয়। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা প্রদান করে।
বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ঘটে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ভারতের অসম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় একইরকম ভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলন সংগ ভাষা বঙ্গ অঞ্চলের বাঙালি অধিবাসীর মাতৃভাষা। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। এছাড়া ভারতের অসম রাজ্যের দক্ষিণাংশেও এই ভাষা বহুল প্রচলিত। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন।
                                      
       
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম                                  ভারতের জাতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর





  Publisher : SK NUR SALAM 
  Published : 19-11-2018